দেশে গ্যাসের সরবরাহ সংকট মেটাতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ১১৫টি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছে পেট্রোবাংলা। এ পরিমাণ কার্গো আমদানিতে অর্থবছরে মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান জরিপ এবং কূপ খননে চলতি ও নতুন প্রকল্পে এডিপিতে মোট বরাদ্দ রয়েছে ১ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। এ হিসাবে চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান জরিপ ও কূপ খননে বরাদ্দের ৫১ গুণ। পেট্রোবাংলার এলএনজি আমদানি ব্যয়ের প্রাক্কলন ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এডিপিতে গ্যাস কূপ খনন ও অনুসন্ধান জরিপ প্রকল্পে বরাদ্দ বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
যদিও জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে গভীর কূপ খনন ও দ্বীপ জেলা ভোলায় গ্যাস কূপ খননে আরো ভিন্ন দুটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। যেখানে মোট ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। সংশোধিত এডিপিতে এসব হিসাব অন্তর্ভুক্ত হলে অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ আরো বেড়ে যাবে বলে জানান পেট্রোবাংলা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহে অন্তত ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে সারসহ বিভিন্ন গ্রাহকের গ্যাস সরবরাহে রেশনিং করতে হয় সংস্থাটিকে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ ঘাটতি কমিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি উৎস কাতার-ওমানসহ স্পট মার্কেট থেকে ১১৫টি এলএনজি কার্গো কিনবে পেট্রোবাংলা। এ এলএনজি কার্গো আমদানি করতে পেট্রোবাংলার ব্যয় হবে মোট ৫৭ হাজার ৯২৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। পেট্রোবাংলা বলছে, এতসংখ্যক কার্গো আমদানি করা গেলে অর্থবছরে (জুলাই-জুন) প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ৮০০ মিলিয়ন থেকে সর্বোচ্চ ৯৭০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে।
পেট্রোবাংলা ২০২৫ পঞ্জিকা বছরে ১০৮ কার্গো এলএনজি আমদানি ব্যয়ের হিসাব প্রাক্কলন করে দেখেছে স্থানীয় ও আমদানীকৃত এলএনজি সরবরাহে গ্যাসের মোট মিশ্রিত ব্যয় হবে প্রতি ঘনমিটারে ২৭ টাকা ৫৯ পয়সা। যেখানে ভারিত গড়ে বিক্রয়মূল্য প্রতি ঘনমিটার ২২ টাকা ৯৩ পয়সা। প্রাইস গ্যাপ বা বিক্রয়মূল্যে পার্থক্য থাকবে ঘনমিটারে ৮ টাকা ৬৬ পয়সা। এ হিসাবে চলতি অর্থবছরে গ্যাস বিক্রি করে ঘাটতি থাকবে ১০ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। এ ঘাটতির অর্থ মেটাতে এবং গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে এরই মধ্যে পেট্রোবাংলার গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো সারশ্রেণীর গ্রাহকের গ্যাসের দাম বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমানে কমিশন এসব প্রস্তাব মূল্যায়ন করছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দেশের গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। ওই অর্থবছরে পণ্যটি আমদানি হয় মোট ১৮ হাজার ৮১৩ কোটি টাকার। পর্যায়ক্রমে এলএনজি আমদানি বৃদ্ধির কারণে ২০২০-২১ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি ব্যয় ছিল ৪০ হাজার কোটি টাকার ওপরে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্যটি কিনতে পেট্রোবাংলা ৫৭ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। এলএনজি আমদানির শুরুর অর্থবছরে আড়াই হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি ছিল। শেষ হওয়া অর্থবছরে এলএনজিতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
দেশে গ্যাসের স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেয়। এ প্রকল্প এখনো চলমান। স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন ও অনুসন্ধানসংক্রান্ত জরিপ কার্যক্রমে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিনটি প্রকল্পের আওতায় এডিপিতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৪১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। যদিও এ তিন প্রকল্পে সরকার মোট ব্যয়ের প্রাক্কলন করেছে ১ হাজার ৯৬৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এডিপি তথ্য থেকে জানা গেছে, হবিগঞ্জ-বাখরাবাদ ও মেঘনা গ্যাস ফিল্ডে থ্রিডি সিসমিক জরিপ প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপিতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১২২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। প্রকল্পটি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে।
তিতাস ও কামতা গ্যাস ফিল্ডে চারটি মূল্যায়ন কাম উন্নয়ন কূপ খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পেট্রোবাংলা। এ প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে ১ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপিতে এ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে সিলেট ১২ নম্বর তেল কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে পেট্রোবাংলার কোম্পানি সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল)। এ কূপ খননে মোট ব্যয় হবে ২৫৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপিতে এ কূপ খননে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
দেশে স্থানীয় গ্যাসের উত্তোলন বাড়াতে চলমান আরো চারটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৭৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে রয়েছে সুন্দলপুর-৪ ও শ্রীকাইল-৫ এবং দুটি অনুসন্ধান কূপ খনন। চলতি অর্থবছরে এ প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪২১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। যেখানে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৮৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ব্লক ৭ ও ৯ নম্বরে টুডি সিসমিক সার্ভে প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১১২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। প্রকল্পটিতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। রশিদপুর ১১ নম্বর কূপ খননে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৮৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে ২৭১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এছাড়া ডুপিটিলা-১ ও কৈলাসটিলা ৯ নম্বর অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পেট্রোবাংলা। এ প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে মোট এডিপিতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৬৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৪৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
এর বাইরে চলতি বছরের ৭ আগস্ট তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাস ক্ষেত্রে দুটি গভীর অনুসন্ধান গ্যাস কূপ খননের জন্য চীনা প্রতিষ্ঠান সিএনপিসি ছুয়াংচিং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের (সিসিডিসি) সঙ্গে ৫৯৪ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটি চুক্তি করেছে পেট্রোবাংলার কোম্পানি বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। এছাড়া চলতি মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) ভোলায় পাঁচটি কূপ খনন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। মোট ১ হাজার ৫৫৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় এসব কূপ খনন করবে পেট্রোবাংলার সাবসিডিয়ারি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)।
স্থানীয় কূপ খনন ও জরিপ কার্যক্রমে সীমিত অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্থানীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়াতে সরকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এডিপিতে যে পরিমাণ কূপ খননের প্রকল্প দেখানো হয়েছে, তার বাইরে নতুন কূপ খনন প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে তা একনেকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আরডিপিতে এসব প্রকল্প যুক্ত হয়নি। এগুলো যুক্ত করা হলে সেখানে বরাদ্দের পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে।’
দেশে চলমান ৫০টি কূপ খনন প্রকল্পের পাশাপাশি সরকার আরো ১০০টি কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব কূপ খনন আগামী বছর শুরু করে ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করতে চায় জ্বালানি বিভাগ। এ প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। পেট্রোবাংলার নিজস্ব অর্থায়ন ও গ্যাস উন্নয়ন তহবিল (জিডিএফ) অর্থ ব্যয় করে এসব কূপ খনন করা হবে।
দেশে এলএনজি আমদানি করে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে এরই মধ্যে পেট্রোবাংলার বিপুল পরিমাণ দেনা তৈরি হয়েছে। বৈদেশিক ও স্থানীয় জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে আর্থিক ব্যয় মেটাচ্ছে পেট্রোবাংলা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড করপোরেশন (আইটিএফসি), বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএমসিএল), বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) কাছে পেট্রোবাংলার মোট ২৮ হাজার ১৬ কোটি টাকার দেনা রয়েছে। এছাড়া জিডিএফ থেকে কোম্পানিটি এলএনজি আমদানি করতে বড় অংকের ঋণ নিয়েছে।
দেশে গ্যাস কূপ খননে অর্থ বরাদ্দ, কূপ খনন পরিকল্পনা নিয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্থানীয় গ্যাসের মজুদ ও উত্তোলন বাড়াতে আগের চেয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। কূপ খননে জিডিএফের অর্থও যেমন ব্যবহার করা হচ্ছে, তেমনি সরকার থেকে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। ফলে সামনের দিনগুলোয় যেহেতু কূপ খনন কার্যক্রম আরো বাড়বে, অর্থায়নও আরো বাড়ানোর চেষ্টা রয়েছে।’